বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ ২০২৩, ০২:৪৬ অপরাহ্ন

সদর ঘাটের সড়কে ঘাটে ঘাটে চাঁ’দা

নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী জার্নাল / ৭৬ বার
আপডেট : সোমবার, ১৮ জুলাই, ২০২২

নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী জার্নাল।। সদর ঘাটের সড়কে ঘাটে ঘাটে চাঁ’দা

আমতলী-ঢাকা রুটের শতাব্দী বাঁধন লঞ্চে সোমবার ভোরে সদরঘাটে এসে পৌঁছান স্কুল শিক্ষক জসীম উদ্দিন। স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মাকেও নিয়ে এসেছেন তিনি। লঞ্চের শীততাপনিয়ন্ত্রিত কেবিনে বেশ স্বস্তি নিয়ে ঘাটে পৌঁছালেও মিরপুরের বাসায় যেতে যে ভোগান্তি আর বাড়তি ভাড়া দিতে হয়েছে তার কোনো হিসেব মেলাতে পারছেন না তিনি।

সদরঘাট টু মিরপুরের যাত্রার ভোগান্তির কথা বলতে গিয়ে এই স্কুল শিক্ষক ঢাকা মেইলকে বলেন, এক কথায় বললে পুরোটা মগেরমুল্লুক। সর্বোচ্চ চারশো টাকা ভাড়া আটশো টাকা দিয়ে অনেক কষ্টে সিএনজি পেয়েছি। এটা কি মানা যায়?

এমন বাড়তি ভাড়া শুধু জসীম উদ্দিনই নন, ভোর থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের যেসব জেলা থেকে লঞ্চযোগে যাত্রীরা ঢাকায় নামেন সবাইকেই গুনতে হয়।

সোমবার সরেজমিন এমন চিত্র দেখা গেছে। ঈদের সপ্তাহ পার হলেও এখনো মানুষ ফিরছে ঢাকায়। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ বেশিরভাগই আসছেন নৌপথে। ফলে সদরঘাটে চিত্র অনেকটা ঈদের সময়ের মতোই লক্ষ্য করা গেছে।

এদিকে মানুষের ভিড়ে সকালে বরিশাল থেকে আসা একটি লঞ্চ থেকে ছোট ছেলে নদীতে পড়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।সদরঘাটে দেখা গেছে, কয়েকশ যাত্রী ঘাটে নেমে গন্তব্যর জন্য সিএনজি অটোরিকশা অথবা রিকশা খুঁজতে খুঁজতে অনেকটা হয়রান হয়ে পড়ছেন।

কেউ আবার বাড়ি থেকে নিয়ে আসা জিনিসপত্র, ব্যাগ একজনকে পাহারা দিতে রেখে সিএনজি অথবা রিকশা খুঁজছেন সদরঘাটের এ মাথা থেকে অন্য মাথায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষায়ও অনেককে দেখা গেছে কাউকে রাজি করাতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করতে। এতে করে বেশি দুর্ভোগে পড়েন নারী-শিশুরা।

যারাও দ্রুত সিএনজি পাচ্ছেন তাদের সবাইকে গুনতে হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া। এমনই একজন উত্তরার যাত্রী শফিকুল ইসলাম। এক হাজার টাকা চুক্তিতে তিনি একটি সিএনজি দীর্ঘক্ষণ পর ব্যবস্থা করে রওনা দিতে দেখা গেছে।

তিনি বলেন, ‘সিএনজি চালকরা সিন্ডিকেট করে এখানে সবাইকে জিম্মি করে রেখেছে। নিজেদের ইচ্ছেমত ভাড়া নেয়। কেউ কিছু বলতেও পারছে না। বাসায় যেতে তো হবে।’

নিজের দুর্ভোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কম হলেও ২০টা সিএনজিচালককে জিজ্ঞেস করেছি উত্তরা যাবে কিনা। তারমধ্যে তিনজন রাজি হয়েছে। কিন্তু কেউ এক হাজার টাকার নিচে যাবে না সাফ জানিয়ে দিয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে উঠলাম।’

একই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মিরপুর-২ নম্বরে যাওয়া যাত্রী স্মৃতি আক্তার  বলেন, ‘যে কয়জনকে মিরপুরের যাওয়ার কথা বলেছি প্রত্যেকেরই একই কথা ৮০০ টাকা ভাড়া দিতে হবে। অথচ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকার স্বাভাবিক সময়ে আসা যায়।’

এদিকে সিএনজিচালকরা বাড়তি ভাড়া নেওয়ার জন্য গতানুগতিক বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেন। তাদের দাবি, লঞ্চের যাত্রী পেতে রাতভর ঘাটে তারা সময় কাটান। ঘাটে তাদের একাধিক জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। ফলে বেশি ভাড়া না নিলে তাদের পোষায় না।

অবশ্য চাঁদা দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যেই দেখা গেছে সদরঘাটে। সিএনজি ঘাট বরাবর রাস্তায় পৌঁছাতেই চিহ্নিত কয়েকজন লোক কারো কাছ থেকে ২০ টাকা, কারো কাছ থেকে ১০ টাকা হারে চাঁদা নেয়। কাউকে কাউকে একাধিকবারও চাঁদা দিতে দেখা গেছে।

অন্যদিকে লালকুঠি এলাকায় পার্কিং জোনে গাড়ি রাখার জন্য টাকা নেওয়ার পাশাপাশি গাড়ি বের হওয়ার সময় একটি চক্রকে চাঁদা নিতে দেখা গেছে।

তবে চাঁদা নেওয়ার বিষয়ে কথা বললে কেউ কিছু না বলে জায়গা পরিবর্তন করে চলে যায়। সবশেষ একজনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয় প্রতিবেদকের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই চাঁদার টাকা সংগ্রহকারী বলেন, ‘আশপাশের সরকারি দলের নেতা, ঘাটের শ্রমিক নেতা, ফাঁড়ি ও পাশের কোতোয়ালি থানার লোকজন এই টাকার ভাগ পায়। আমরা তুলে দেই। বিনিময়ে আমাদেরও দৈনিক টাকা দেয়।’

এতো গেলো সিএনজির কথা। সাধারণ রিকশাচালকরাও ঢাকায় ফেরা হাজারো মানুষের ভিড়কে পুঁজি করে বাড়তি ভাড়া হাঁকান। দেখা গেছে, সদরঘাটে সকালে কোনো রিকশা ১০০ টাকার নিচে ভাড়া চায় এমন পাওয়া কঠিন।

এদিকে ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় বিভিন্ন গন্তব্যের গণপরিবহনও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। কেউ রুটের শেষ মাথার যাত্রী ছাড়া কাউকে বাসে তোলেন না। তাও আবার ন্যূনতম দ্বিগুণ ভাড়ায়।

বাস চালক ও শ্রমিকদেরও দাবি, ঘাটের দিকে যত বেশি আগে রাতে গাড়ি রাখতে চান ততই চাঁদা বেশি দিতে হয়। ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত গাড়ি রাখতে চাঁদা দিতে হয় বলে জানান পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

সার্বিক বিষয় নিয়ে পক্ষ থেকে কথা বলা হয় কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে।চাঁদা নেওয়ার বিষয়টি নজরে আছে এমনটা জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের ইজারাদারদের পক্ষ থেকে এখানে দুই একটা স্পটে চাঁদা নেওয়ার কথা শুনেছি। তারমধ্যেও গণ্ডির বাইরে চাঁদা নেওয়ার তথ্য পেয়ে সিটি করপোরেশন লিখিতভাবে বিষয়টি অবহিত করেছি।

এখনো কোনো ফিডব্যাক পাইনি। তাদের উত্তর পেলে অন্যায়ভাবে টাকা নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরবাইরে যে বা যারা চাঁদা নিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপনি তিনদিনের মধ্যে রেজাল্ট পাবেন।’

পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদার ভাগ পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এমন কোনো সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সবসময় এসব বিষয় নজর রাখছেন।’

এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ন বেআইনী এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ তাসরিফ/নরসিংদী জার্নাল

Facebook Comments Box


এ জাতীয় আরো সংবাদ